কৃষ্ণসাগরে সংঘাত: বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে, বলছে এফএও
জারনিউজ ডেস্ক
এবারের গ্রীষ্মে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুই দেশ একে অপরের জাহাজ ও বন্দর অবকাঠামোয় পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে, যার প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।
সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ খাদ্যমূল্য সূচক
গত শুক্রবার প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে এফএও জানায়, আগস্টে তাদের খাদ্যমূল্য সূচক (এফএফপিআই) গড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে উঠেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। জুলাইয়ের সংশোধিত ১৩০ দশমিক ৮ পয়েন্ট থেকে এই বৃদ্ধি প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পরপর যে রেকর্ড উচ্চতায় সূচক উঠেছিল, তার চেয়ে এখনো প্রায় ১৬-১৭ শতাংশ নিচে আছে সূচকটি।
এফএওর তথ্যমতে, খাদ্যপণ্যের প্রায় সব শ্রেণিতেই দাম বেড়েছে। শস্যের মূল্যসূচক মাসওয়ারি হিসাবে ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার পেছনে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য রপ্তানি নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া চিনির মূল্যসূচক এক মাসেই প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চে উঠেছে, আর ভোজ্যতেলের সূচকও সামান্য বেড়ে ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বজুড়ে গম, ভুট্টা, জোয়ার, যব ও চালের দামও বেড়েছে।
একই সঙ্গে এফএও ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাসও কমিয়েছে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসের তুলনায় ৩৪ লাখ টন কমিয়ে নতুন পূর্বাভাস দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯৮ কোটি টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ কম এবং ২০১৮ সালের পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন।
নাবিকদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়
সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাবিকদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়েছে। জুলাইয়ে কৃষ্ণসাগরে যত নাবিক নিহত হয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক মাসে এত মৃত্যু আগে ঘটেনি। ফলে কৃষ্ণসাগর এখন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলপথ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। তুরস্কের নাবিক ইউনিয়ন তুর্কিয়ে দেনিজচিলের সেনদিকাসির হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে কৃষ্ণসাগরে ৩৫টি জাহাজে হামলার ঘটনায় ২৩ জন নাবিক নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরেও জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের নৌপরিবহন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) প্রধানও বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথের নিরাপত্তার সার্বিক অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ওদেসা-চর্নোমর্স্কে ফের হামলা, পাল্টা জবাব ইউক্রেনেরও
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পরই কৃষ্ণসাগরের ইউক্রেনীয় বন্দরে নোঙর করে থাকা জাহাজ ও বন্দর অবকাঠামোয় দফায় দফায় হামলা চালিয়েছিল রাশিয়া, যাতে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিয়েভের শস্য রপ্তানি। গত জুলাইয়ে রাশিয়া আবারও ইউক্রেনের প্রধান শস্য রপ্তানি কেন্দ্র ওদেসা ও চর্নোমর্স্ক বন্দরে হামলা চালায়। জুলাই-আগস্ট জুড়ে ওদেসা অঞ্চলের বন্দরগুলোয় রুশ হামলা অব্যাহত ছিল, যার মধ্যে ইউক্রেনীয় গম বোঝাই একটি গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী মালবাহী জাহাজেও হামলার ঘটনা রয়েছে।
তবে কৃষ্ণসাগর ও এর সঙ্গে কের্চ প্রণালি দিয়ে যুক্ত আজভ সাগরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে ইউক্রেনের পাল্টা হামলারও ভূমিকা আছে। ইউক্রেন ড্রোন দিয়ে একাধিক রুশ জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে ট্যাংকারও রয়েছে। কিয়েভের দাবি, এসব ট্যাংকার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল রপ্তানিতে ব্যবহৃত শত শত জাহাজের সমন্বয়ে গঠিত ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ। রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর নভোরোসিস্কেও জাহাজ ও বন্দর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন, যা তেল ও শস্য রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর।
পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত মিলেছে তুরস্কের কৃষ্ণসাগর উপকূলে। রুশ পতাকাবাহী পরিত্যক্ত এক পণ্যবাহী জাহাজের নিয়ন্ত্রণকক্ষ আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর সেটি তুরস্কের উপকূলে আটকা পড়ে, যা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় পর্যটকেরা।
সামুদ্রিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ডের বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হামলা এখন আর শুধু বন্দর ও তার আশপাশে সীমাবদ্ধ নেই—কৃষ্ণসাগরের আরও বিস্তৃত এলাকায় জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শঙ্কায় আমদানিনির্ভর দেশগুলো
রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় শস্য রপ্তানিকারক দেশ, যার উল্লেখযোগ্য অংশ যায় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয়—বিশেষ করে তুরস্ক ও মিসরে। শস্য রপ্তানিতে বিশ্বে ইউক্রেনের অবস্থান পঞ্চম। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার সমুদ্রপথে শস্য রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি হয় কৃষ্ণসাগরের বন্দর দিয়ে, আর প্রায় ২০ শতাংশ হয় আজভ সাগর দিয়ে।
জুলাইয়ে ইউক্রেনের একের পর এক ড্রোন হামলার জেরে আজভ সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় রাশিয়া, পরে বিকল্প পথ—কাস্পিয়ান সাগর, বাল্টিক সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে কিছু খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে দেশটি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশেরই শস্য রপ্তানি ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় খাদ্যের দামে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গম, যব ও ভুট্টা আমদানিনির্ভর দেশগুলো।
