গুজবের শিকার একের পর এক অভিনয়শিল্পী, বিব্রত ও বিপর্যস্ত তারকারা
জারনিউজ ডেস্ক
বড় পর্দা কিংবা ছোট পর্দার অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে সম্প্রতি একের পর এক গুজব ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব গুজবের মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর ভুয়া খবর, অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার মিথ্যা ঘোষণা, এমনকি বিয়ে বা শুটিংয়ের বিভিন্ন ঘটনার বিকৃত স্থিরচিত্রও। অথচ যাঁদের নিয়ে এসব খবর ছড়ানো হচ্ছে, তাঁরা নিজেরাই এসব সম্পর্কে কিছু জানেন না। এমন ঘটনায় বিব্রত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন শিল্পীরা। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি ও অভিনয়শিল্পী সংঘের নেতাদের ভাষ্য, গুজবের কাছে মামুনুর রশীদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, পপি থেকে দিলারা জামান—সবাই অসহায়, আর কেউ কেউ মনে করছেন পরিকল্পিতভাবেই শিল্পীদের হেয় করা হচ্ছে।
ইলিয়াস কাঞ্চনের ভুয়া মৃত্যুর খবর
গত ২৬ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব। ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত এই অভিনেতা বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন এবং গত বছরের এপ্রিল থেকে সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে; গত বছরের আগস্টে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারও হয়েছিল। শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় অনেকেই মৃত্যুর খবরটি সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন, যদিও পরে জানা যায় খবরটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া।
এই ঘটনার পর নিসচার নেতারা বলেন, মৃত্যু, দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তথ্য প্রকাশের আগে পরিবার, নিকটাত্মীয় বা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। তাঁদের মতে, জীবিত মানুষের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে দিলে তাঁর পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে, তাই যাচাই না করে এমন তথ্য শেয়ার করা অনৈতিক ও ক্ষতিকর।
হাসান মাসুদের অভিনয় ছাড়ার মিথ্যা দাবি
এর আগে ছোট পর্দার অভিনেতা হাসান মাসুদের ছবিসহ একটি স্থিরচিত্র ছড়িয়ে পড়ে, যাতে দাবি করা হয় তিনি আর অভিনয় করবেন না এবং সম্পূর্ণভাবে ধর্মচর্চায় মনোযোগ দেবেন। এই খবরে অনেক সহকর্মী মর্মাহত হন। পরে প্রথম আলোকে হাসান মাসুদ জানান, তিনি কোথাও অভিনয় না করার কথা বলেননি; বলেছিলেন, ভালো চরিত্র পেলে অভিনয় করবেন, আর না পেলে হয়তো ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। সেই বক্তব্যকেই বড় করে অভিনয় ছাড়ার খবর হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় বিব্রত হন হাসান মাসুদ নিজে, পাশাপাশি কষ্ট পান তাঁর অনেক সহকর্মীও, যাঁদের অনেকেই অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে ধর্মচর্চা করেন।
পপির ‘অভিনয় ছাড়ার’ ভুয়া বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
দীর্ঘদিন ক্যামেরার আড়ালে থাকা চিত্রনায়িকা সাদিকা পারভীন পপির ছবি ব্যবহার করে একটি ফটোকার্ড হঠাৎ ভাইরাল হয়, যেখানে দাবি করা হয় অভিনয়কে ‘পাপ’ মনে করে তিনি চলচ্চিত্রজগৎ ছেড়ে দিচ্ছেন। পপির নামে বসিয়ে দেওয়া এই বক্তব্য ঘিরে ফেসবুকে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়, এমনকি চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ ও উপস্থাপক-অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয়ও এ নিয়ে সমালোচনা করেন। পরে জানা যায়, ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটি আদতে পপির নয়, সম্পূর্ণ ভুয়া।
এ প্রসঙ্গে পপি প্রথম আলোকে নিজের দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনের কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি এই ইন্ডাস্ট্রিকে নিজের পরিবার মনে করেন এবং চলচ্চিত্রের প্রতিটি মানুষের আয়কে শতভাগ হালাল বলে বিশ্বাস করেন।
মামুনুর রশীদকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার
সুইমিংপুলে এক তরুণীর সঙ্গে মামুনুর রশীদের একটি ছবি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচার চলে, যা পরে অনলাইনে খবর হিসেবেও প্রকাশ পায়। অনেকেই ধরে নেন ঘটনাটি বাস্তব, অথচ ছবিটি ছিল ‘আমরা ভাইরাল’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকের দৃশ্য মাত্র।
বিষয়টি নিয়ে বিব্রত মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, সত্যতা যাচাই না করে ঘটনা প্রকাশ করে দেওয়ার প্রবণতার কারণেই শিল্পীদের এমন বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মানুষ এখন অনেক কিছু যাচাই না করেই সত্য বলে মেনে নিচ্ছে, তাই মানবিক জায়গা থেকে সবার আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
দিলারা জামানের বাড়ি দখলের ভুয়া খবর
মামুনুর রশীদের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আলোচনায় আসেন বরেণ্য অভিনেত্রী দিলারা জামান। দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বাড়ি দখল হয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে দিলারা জামানের নামে বাড়ি নিয়ে ধারদেনা ও ভাড়াটের কাছ থেকে বাড়ি দখল হয়ে যাওয়ার বিবরণ তুলে ধরা হয়।
যাচাই ছাড়াই তথ্য প্রচারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ
শিল্পী নেতাদের ভাষ্যে, একের পর এক এসব ঘটনা প্রমাণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচারের প্রবণতা কতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। খ্যাতিমান শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবন, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এমনকি সম্পত্তি নিয়েও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় তাঁরা শুধু মানসিক চাপেই পড়ছেন না, তাঁদের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে অহেতুক উদ্বেগ। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ বা শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাইয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন
মন্তব্য প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় অনুমোদন প্রয়োজন।